আগুনের স্বভাব

আগুনের স্বভাব

লেখক – অ ল ক জা না

বন্দীদশার প্রথম কটাদিন বলা যায় বেশ উপভোগ্য ছিল। কিন্তু বিষাদমগ্ন প্রহর থমকে দাঁড়িয়ে যেতেই সেই মুগ্ধতার ভেতর জেগে উঠছে নিদারুণ এক ভয়। যে শাসন করছে মাটি মানুষ এবং প্রকৃতি। আকাশের সমস্ত উদারতাকে খুবলে খাচ্ছে দুঃস্বপ্নময় একটা ক্যাকটাস। সামনে পেছনের কিছু দিন কিছু রাত্রির গতিবিধি তবু এখনোও অনুমান করা যাচ্ছে। কিন্তু করোনা পরবর্তী পরিস্থিতির চেহারা, আচার, স্বভাব কতটা দুর্বিষহ মারমুখী হতে পারে তা ভাবতে গেলেই হাতপা যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী হবে,কী হতে পারে ভাবতে গেলেই মনে হচ্ছে দম আটকে অক্কা। সরে আসি, স্বাদ বদলাতে টুকিটাকি তামাসা মস্করায় নাক গলানোর চেষ্টা করি কিন্তু সে রাস্তাও যেন আমার নাকের তুলনায় অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে।

আসল কথাটা হলো আমাকে অসুখে পেয়েছে। নিজের জন্য ? মোটেও না। বলতে পারেন আপনার জন্য। আপনার সকাল দুপুর রাত্রি আমার সঙ্গে মেলাতে চাইছি ? কী ভাবেন আমাকে পাগলা কুকুরে কামড়েছে ? না না এই ভেবে মরমে পুড়ছি, যেভাবে বিপন্নতা চারিদিকে সমান উৎপীড়ন চালাচ্ছে তাতে কষ্টকরা মাটির কাছাকাছি মানুষগুলোর রূপরেখায় আপনার অবস্থানটা নেমে এলে কেমন হবে একবারটি বন্ধ চোখে ভাবুন। ঠিক এটাই ভেবে আমার মন পরের পঞ্চাশ বছর বয়স বাড়িয়ে ফেলেছে। ট্যাপ খোলার অপেক্ষায় থাকে আপনার নিয়ন্ত্রিত জলধারা। আমরা সমবায় নলকূপের মেজাজি সহাস্য জল ভাগ করে নিচ্ছি কলসি বালতি মগ ডেকচিতে। উঠোনের পালিত সেদ্ধ পুঁইপাতায় ভাতমেখে পিঁপড়ে মাছিতে জমজমাট একটা দুপুর। আর আপনি নানাবিধ পদের আতিশয্যে বেছে নিচ্ছেন জ্বিহাসুখী রান্নার ঘ্রাণ। আরে মোশায় এ ত গেল করোনা যাপন, মানে লকডাউনের ভোজনপর্ব।

অসুখ সেরে যেতে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি পিচরাস্তার বুক চিরে বেরিয়ে পড়েছে সারি সারি গাছের উল্লসিত সবুজ বিপ্লব আর আকাশের নীলমাতৃত্ব খুবলে নিচ্ছে ক্যাকটাসের মহাজোট। পিপীলিকার অসহিষ্ণু ব্যস্ততা আর মানুষকে মানুষ ছিঁড়ে খাওয়ার বাকি অংশটুকু ঠোকরাচ্ছে অভয় কাকেরা। ছবিটা একবার ভাবুন। অর্থনীতির সুয়োরানী, স্তনে সভ্যতার বিষে আক্রান্ত হয়ে তখন পড়ে আছে পুতনা রাক্ষসীর মতো। সত্যি আর ভাবতে পারছি না। শিউরে উঠছি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিপন্ন অস্তিত্বের জন্য। মাথায় বেড়ে যাচ্ছে তীব্র অসাংবিধানিক তাপ। আমার কী করা উচিত। বা কী করা অনুচিত। সেটারই বড় অভাববোধ করছি এমুহূর্তে। তবুও ভালো এখনো আমি বেঁচে আছি আপনিও আছেন জেনে সামান্য হলেও স্বস্তি।

আগুনের স্বভাবই সবকিছু ছুঁয়ে দেখা। হতে পারে আপনি সামান্য ঝলসে গেছেন, আমি ছাই হয়ে অস্থির বাতাসের জন্য অপেক্ষা করছি। খসে পড়া পলেস্তারার মতো অসহায় ভারসাম্যহীন অর্থনীতি কত যুগ পেছনে টেনে ধরেছে তা আর কটাদিন কাটলেই সে ছবি আরো প্রকট হয়ে উঠবে। এখনো সময় আছে, সবকিছু হারিয়ে অথবা হাতের বাইরে যাওয়ার আগে চাই সচেতনতা। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ দৃষ্টি পাতের চেয়ে এ মহামারি রোধের মহৌষধ আর কী হতে পারে। একা বাঁচার ইচ্ছে থাকলে তবে মানুষ হয়ে জন্মালাম কেন ? যাইহোক না কেন আপনার ভেতরের শিক্ষা এতটাও অপদার্থ নয় যে আমার এই কথাগুলোকে আপনি সমর্থন করবেন না ??

1 thought on “আগুনের স্বভাব”

Leave a Comment